ছোট্ট শেখ রাসেলের গল্প

 

১৫ আগস্ট ২০১৫, ১২:২৯ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০১৫, ১২:৪৬
আজ তোমাদের একটি গল্প শুনাবো, তোমাদেরই মতো এক ছোট্ট বন্ধুর গল্প। তখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর। ধরতে গেলে দেখা হয়নি পৃথিবীর তেমন কিছুই, কেবল নিজের চারপাশ, একটা মুক্ত

আকাশ, মাথার ওপর উড়ে যাওয়া কয়েকটি হলুদ পাখি ছাড়া। তোমাদের মতো তারও ছিল এক দুরন্ত শৈশব, হাসত, খেলত, গল্প করত। বাবা তার দেশের কাজে ভীষণ ব্যাস্ত, মিটিং, মিছিল, কখনো আবার বদ্ধ জেলখানা। তাই বাবাকেও কাছে পেত তেমন বেশি না। তোমরা বাবার সাথে কত মজা কর, তাই না? সেও অবশ্য করত, তবে তোমাদের মতো সারাক্ষণ বাবাকে এত কাছে পেত না। এ জন্য সে কি করত জানো? মাঝে মাঝে মাকেই বাবা বলে ডাকত! বাবাকে কাছে না পেলে কী আর করার আছে বলো?

ভাবছ কার গল্প বলছি? বলছিলাম শেখ রাসেলের কথা, আমাদের শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে শেখ রাসেল। চিনেছ নিশ্চই, রাসেলকে কে না চিনে বলো? রাসেল এত দিন বেঁচে থাকলে হয়ে উঠত ৫০ বছরের এক পরিপক্ব মানুষ। অবশ্য বয়সের যাত্রায় তেমনটা পেরে উঠতে পারেনি রাসেল। ঘাতকের বুলেট স্তব্ধ করে দিয়েছে তার দুরন্ত পথচলা, মুখফোটা হাসি, সে কথা অজানা নয় তোমাদের কারো। তাও প্রায় ৪০ বছর হলো, সেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। কত দীর্ঘ সময়, কেমন দ্রুতই চলে যায়, আবার কেমন যেন আটকে থাকে ঠিক সেই একই জায়গায়। সেই জন্যই হয়তো আজ আবার ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ নয়, ২০১৫। ৪০টা বছরের পার্থক্যই শুধু। এই ৪০ বছরে অবশ্য পাল্টে গেছে পৃথিবীর অনেক কিছুই, মুছে গেছে রাসেলের গা থেকে চুইয়ে পড়া তাজা রক্তের দাগ। তবুও কেন যেন মনে হয় রাসেল আজও আছে, এইতো বাতাসে ভাসছে তার অকৃত্রিম হাসি, এইতো সে তার মাকে বাবা বাবা বলে ডাকছে। খুব মন খারাপ লাগছে, তাই না? লাগবেই তো। এত সুন্দর ফুটফুটে একটা ছেলেকে, যার বয়স নাকি মাত্র ১০ বছর, তাকে মানুষ কেমনে খুন করতে পারে? খুনিরা মনে হয় জানোয়ারই হয়, মানুষ থাকলে তো এটা কখনোই সম্ভব নয়। রাসেল বুঝত না রাজনীতির কিছুই, কিন্তু তাকেই কি না হতে হলো রাজনীতির বলি। তার বাবা রাজনীতি করতেন, তাতে রাসেলের কী দোষ ছিল?

রাসেলের আরো কিছু গল্প শুনাই তোমাদের। রাসেল ছিল বঙ্গবন্ধুর সর্বকনিষ্ঠ ছেলে, তাই পরিবারে আদর একটু বেশিই ছিল, তোমাদের যেমন বাড়ির সবাই আদর করে। তার বাবা তাকে ভালোবাসতেন খুব। বাসায় ফিরে ঘরে ঢুকে বাবা প্রথমেই খুঁজতেন রাসেলকে। রাসেল, রাসেল বলে ভরাট কণ্ঠে ডাক দিতেন তার নাম ধরে। রাসেলও বঙ্গবন্ধুকে প্রচণ্ড ভালোবাসত। বাবাকে কাছে পাওয়ার জন্য, বাবার কোলে চড়ার জন্য অপেক্ষায় থাকত সব সময়। বাবার ডাক শোনার সাথে সাথেই এক দৌঁড়ে ছুটে আসত বাবার কাছে। অনেকক্ষণ পর বাবাকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরত, কিংবা উঠে পড়ত কোলে। বঙ্গবন্ধু তাকে কোলে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন পরম আদরে। বাবার চশমাটাকে দারুণ লাগত তার, তাই সেটা বাবার চোখ থেকে খুলে নিজের চোখে লাগিয়ে নিতে বেশ মজা লাগত ওর। গল্প শুনতে খুবই ভালোবাসত ছোট্ট শেখ রাসেল। বাবা অবসরে থাকলেই গল্প শোনানোর জন্য আবদার জুড়ে দিত, তোমরা যেমন বাবার কাছে বায়না ধর। বঙ্গবন্ধুও সময় পেলে বেশ আগ্রহ নিয়ে গল্প শোনাতেন। রূপকথার গল্প অবশ্য নয়, বাবা শুনাতেন একটি নিপীড়িত দেশ ও তার মানুষ এবং সংগ্রামের ইতিহাস, স্বাধীনতা অর্জনের গল্প। এসব গল্প শুনে হয়তো রাসেলেরও ইচ্ছা জাগত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার, যুদ্ধ করে দেশটাকে স্বাধীন করার। রাসেলও গল্প শোনাত তার বাবাকে। রাসেল নাকি কথা বলত খুব মজা করে। বরিশাল, ফরিদপুর ও ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দু মিশিয়ে শিশুসুলভ কথা বলত রাসেল। শিশুদের কথা তো শুনতে ভালই লাগে। রাসেলের কথা বলার ভাষা শুনে বাবা হেসে উঠতেন, চেষ্টা করতেন জগাখিচুড়ি ভাষায় জবাব দিতেন। এত ব্যস্ততার মাঝেও বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠতেন একজন প্রিয় পিতা। পিতা-পুত্রের আনন্দঘন আড্ডায় পুরো বাড়ি যেন স্বর্গ হয়ে উঠত।

রাসেলের নামকরণের রয়েছে একটি মজার পটভূমি। বাবা ছিলেন ভীষণ পড়ুয়া। জেলে বসেও প্রচুর পড়াশোনা করতেন তিনি। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ছিল বঙ্গবন্ধুর খুব প্রিয় একজন লেখক। বঙ্গবন্ধু মাঝে মাঝে শেখ রাসেলের মাকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন বার্ট্রান্ড রাসেলের দার্শনিকতা। এসব শুনে রাসেলের ভক্ত হয়ে ওঠেন মা এবং নিজের ছোট সন্তানের নাম রেখে দেন রাসেল। বাবা জেলে থাকায় বাড়িটা থাকত নীরব, রাসেলেরও থাকত মন খারাপ। তাই মা রাসেলের মন ভালো রাখার জন্য বুদ্ধি করে কিনে দেন একটা তিন চাকার সাইকেল। ছোট মানুষ, দুই চাকার সাইকেল চালানোর বয়স তো তখনো হয়নি তার। মায়ের কিনে দেওয়া সাইকেলটা নিয়ে সারাদিন খেলায় মেতে থাকত রাসেল। বাড়ির উঠোনের এ কোণ থেকে ও কোণে সাইকেল চালিয়ে বেড়াত সে। রাসেল কেমন বুদ্ধিমান ছিল জানো? বাসায় একটা ছোটখাটো লাইব্রেরি ছিল। লাইব্রেরির বই থেকে বোনরা তাকে গল্প পড়ে শোনাত। একই গল্প কদিন পর শোনানোর সময় দু-এক লাইন বাদ পড়লে সে ঠিকই ধরে ফেলত। বলত ও, সেই লাইনটা পড়নি কেন? রাসেল মায়ের কাছে দেখে বাড়ির কবুতরগুলোকে খাবার দিত, কিন্তু কবুতরের মাংস খেত না। মজার, তাই না? আসলে রাসেল ছিল বাবার মতোই সাহসী এবং মানুষ ও প্রাণীদেরও ভালোবাসত। টমি নামে রাসেলের একটা পোষা কুকুর ছিল। টমির সঙ্গে ওর খুব বন্ধুত্ব ছিল। তোমাদের মতো রাসেলও তার পোষা টমির সঙ্গে খেলা করত। একদিন খেলার সময় টমি জোরে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠলে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়, কাঁদতে কাঁদতে ছোট আপাকে বলে, টমি বকা দিচ্ছে। অথচ নিজের খাবারের ভাগও দিত টমিকে। আর সেই টমি তাকে বকা দিয়েছে। এটা সে মেনে নিতে পারত না। এমন একটা চঞ্চল, নিষ্পাপ ছেলেকেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালোরাতে ঘাতকের দল মেরে ফেলল। শেখ রাসেল তার সোনালি শৈশব পেরুতে পারেনি আজও। তবে মরেছে কি? না মরেনি, তোমাদের মাঝেই রাসেল বেঁচে থাকবে চিরদিন, সেই ছোট্ট রাসেল হয়ে, তোমাদের বন্ধু হয়ে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s