‘আই এ্যাম জিপিএ ফাইভ’ (ভিডিও) নিজস্ব প্রতিবেদক | মে ৩০, ২০১৬ |

নিজস্ব প্রতিবেদক | মে ৩০, ২০১৬ | বিবিধ

GPA-5-home

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির নাম জানে না এ প্লাস পাওয়া  শিক্ষার্থী। জানে না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কতো তারিখে? অপারেশন সার্চলাইট কি? এই প্রশ্নের জবাবে এক শিক্ষার্থী বললেন, ‘অপারেশনের সময় যে লাইট জ্বালানো হয় সেটাই অপারেশন সার্চলাইট। বেসরকারী মাছরাঙা টেলিভিশনের সাংবাদিক আনোয়ার হোসেনের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকার একাধিক স্কুল থেকে এ প্লাস পাওয়া বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল জিপিএ-৫ কি? বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির নাম কি? স্বাধীনতা দিবস কতো তারিখে? বিজয় দিবস কতো তারিখে? উত্তর দিতে পারেন নি জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবীরা।

এ নিয়ে আবারো প্রশ্ন উঠেছে দেশের শিক্ষার মান নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীরা কি সত্যিই মেধাবী? জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান নিয়ে আগেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। আনোয়ার হোসেনের এই প্রতিবেদনটি যেন সেই প্রশ্নটি আবারো সামনে নিয়ে এসেছে।

আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ঢাকার ৬টি স্কুল থেকে এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদেরকে বেশ কিছু প্রশ্ন করেছি। স্কুলগুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে তাদের বন্ধুদের নিয়ে আসতে বলেছি। তাদের প্রায় সবাইকে কমন কিছু প্রশ্ন করেছি। কিন্তু তারা খুবই হতাশাজনক উত্তর দিয়েছে।’

বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, ‘বিজ্ঞানের ছাত্র বলে বাংলা কিংবা সাধারণ জ্ঞান কম পড়া হয়। এজন্য শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ কোথায় তিনি জানেন না। এ প্রসঙ্গে ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বিজ্ঞানের ছাত্র বলে সাধারণ জ্ঞান পড়বে না এটা ঠিক নয়। এতে করে শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা পাচ্ছে না।’

মাছরাঙার সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার ক্লাসের ব্যাপারে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কম্পিউটারে তোমরা কি করো? তারা জানিয়েছে, কম্পিউটারে ফেসবুক, গান শোনার জন্যই ব্যবহার করে। হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার কি শিক্ষার্থীরা জানে না।’

শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের হাতে জিপিএ-৫ তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এটা অর্জন করছে না। ফলে আমাদের জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, মান বাড়ছে না।’

আনোয়ার হোসেনের এই প্রতিবেদনটি এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনা ছড়িয়েছে। শহীদ আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ ফেসবুকে লিখেন, ‘অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী অপারেশন সার্চলাইট বলতে কী বোঝায় তা বলতে পারেন না। সাহস করে তারপরও এক ছাত্রী বলেছেন, অপারেশনের সময় যে লাইটটি ব্যবহার করা হয় তাকেই অপারেশন সার্চলাইট বলে। সেই ছাত্রীকে আমার পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। আপনি আগামী বাংলাদেশের বাঘের বাচ্চা। বাঘাবী।’

মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রতিবেদনের সেই প্রশ্ন-উত্তরগুলো হুবহু তুলে দেওয়া হলো:

প্রশ্ন : জিপিএ- এটার পূর্ণাঙ্গ রূপ কী?

১. জানি না

২. এখন মনে পড়ছে না

৩. গ্রেটিং পয়েন্ট

প্রশ্ন : এসএসসি- এটার পূর্ণাঙ্গ রূপ কী?

১. এখন আর মনে পড়তেছে না

২. জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট

৩. স্কুল সেকেন্ডারি সার্টিফিকেট

প্রশ্ন : আমি জিপিএ ফাইভ পেয়েছি- এটার ইংরেজি কী হবে?

১. মাথা নিচু করে হাসি

২. আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ

৩. আই গিভ এ্যা জিপিএ ফাইভ

৪. আই গেট জিপিএ ফাইভ

৫. আই উইল… পারতেছি না (হাসি)

প্রশ্ন : শহীদ মিনার কোথায়?

স্যরি, জানি না

প্রশ্ন : অপারেশন সার্চলাইট কী?

১. জানি না

২. অপরেশন করার সময় যে লাইটটা জ্বালায় ওইটাই তো জানি, আর বেশি কিছু জানি না

৩. ২৫ শে মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি বাহিনী যে প্ল্যানিং করে আমাদের দেশে হঠাৎ আক্রমণ করে ওটাকেই অপারেশন সার্চলাইট বলা হয়

প্রশ্ন : শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস কবে?

১. শহীদ বুদ্ধি দিবস উমমম জানি না

২. ১৭ই আগস্ট

৩. ১০ই ডিসেম্বর

প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কবে?

জানি না

প্রশ্ন : স্বাধীনতা দিবস কত তারিখ?

১৬ই ডিসেম্বর

প্রশ্ন : বিজয় দিবস কবে?

২৬শে ডিসেম্বর

প্রশ্ন : জাতীয় স্মৃতিসৌধ কোথায়?

এটা পারি না

প্রশ্ন : রণ সঙ্গীত কে রচনা করেছেন?

১. পারি না

২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রশ্ন : বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা কে?

কাজী নজরুল ইসলাম

প্রশ্ন : মাউন্ট এভারেস্ট কোথায়?

ইংল্যান্ড

প্রশ্ন : তুমি সায়েন্সে পড়েছ। পিথাগোরাস কে?

পিথাগোরাস একজন উপন্যাসিক।

প্রশ্ন : নিউটন কোন তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত?

জানি না

প্রশ্ন : আইনস্টাইনের কোন তত্ত্ব কি তোমাদের পড়িয়েছে?

না, নিউটনের পড়ছি, কিন্তু আইনস্টাইনের পড়িনি

প্রশ্ন : নিউটনের তত্ত্বটা কী?

১. ইমমমমমম

২. গাছ থেকে আপেল পড়ে যে… নামটা মনে নাই

প্রশ্ন : বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতির নাম কী?

১. জানি না…

২. এমমমম….

প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে কয়টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল?

৯টি

প্রশ্ন : নেপালের রাজধানীর কোথায়?

নেপচুন

প্রশ্ন : তুমি তো কম্পিউটার ব্যবহার কর…

ব্যবহার করি। মাঝে মাঝে আর কি এই ফেসবুকে থাকি। গান-টান শুনি।

প্রশ্ন : হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার এটার মানে বুঝ?

উহুম… জানি না।

প্রশ্ন : তোমরা কী পাঠ্য বইয়ের বাইরে কোন বই পড়?

এমনি মানে গল্পের বই পড়ি

প্রশ্ন : কার গল্প?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পের বই পড়ি

প্রশ্ন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা গল্পের নাম বল তো

……….

প্রশ্ন : কেন এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছ না?

প্রথম কথা হলো, আমি সংবাদ দেখি না। নিউজ পেপার পড়ি না।

প্রশ্ন : পাঠ্য বইয়ের যে সিলেবাসটা দেওয়া আছে, ওই সিলেবাসের মধ্যেই সব সময় সীমাবদ্ধ থাক?

ওইগুলাই সীমাবদ্ধ থাকি। সায়েন্সের সাবজেক্টগুলা একটু বাইড়ায় পড়ি। কিন্তু বাংলা-সমাজ এগুলা নিয়ে আমার বেশি ঘাটতি আর কি…

বিষয়টি নিয়ে এবার নিজের ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেনপ্রবাসী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আমিনুল ইসলাম। ভিডিও সম্পর্কে এসব কথা বলা শেষে আমিনুল ইসলাম নিজের কিছু অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন, এই সব দেখে বাংলাদেশে আমার কয়েকজন সহকর্মীর কথা মনে হলো। আমি বাংলাদেশের সব চাইতে নামকরা দুটো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি।

এর মাঝে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আবেদন করার যোগ্যতা হচ্ছে জিপিএ ৫। অর্থাৎ জিপিএ ৫ না পেলে আবেদন করাই যায় না। তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয়! তাই আমার সব সহকর্মীরা ছিলেন হয় ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাশ করা! এরা প্রায়ই আমাকে বলতো- সমাজ বিজ্ঞান পড়ে কি হবে! একবার আমার এক সহকর্মী, যে কিনা ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষক, আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি সমাজ বিজ্ঞানে পড়েছেন কেন, এইসব সাবজেক্টে পড়ে কি হয়?

এই ভদ্রলোককে আমি উল্টো জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়েছেন কেন? তিনি বলেছিলেন- ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য! একবার আমেরিকা থেকে এক গবেষক আসলেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি আবার ওই ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষকের সাথে কথা বলছিলেন। তো ওই আমেরিকান ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হোয়াট ইজ ইউর রিসার্চ ইন্টারেস্ট? (অর্থাৎ তার গবেষণার বিষয় কি বা কোন বিষয়ে সে গবেষণা করতে চায়)

ওই ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষক উত্তর দিয়েছে, আই এম ইঞ্জিনিয়ার!

আমেরিকান ওই গবেষক এর পর আমাদের ইউনিভার্সিটিতে যতক্ষণ ছিলেন কোনো কথা বলেননি। তিনি হয়তো ভাবছিলেন-একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কি করে এই ধরনের উল্টো-পাল্টা উত্তর দেয়! এই হচ্ছে আমাদের শিক্ষক এবং শিক্ষাব্যবস্থা! এরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য! কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তরও সঠিকভাবে ইংরেজিতে দিতে পারে না! উত্তর দিবে কি, প্রশ্নই তো বুঝে না!

এরপর সাম্প্রতিক সময়ের ছেলেমেয়েদের কথা টেনে তিনি লিখেন, এই যে যেই ছেলেপেলেগুলো জিপিএ ৫ পেয়ে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি; এতে আমি অবাক হয়নি। আমি চিন্তিত হচ্ছি, তাদের ব্যবহার দেখে। যারা ভিডিওটা দেখেছেন, তারা খেয়াল করে দেখবেন, তারা যে ভুল উত্তর দিচ্ছে বা জানে না একটা বিষয়; তাদের মুখ দেখে একবারও মনে হলো না যে তারা লজ্জিত এই জন্য। উল্টো তারা হাসছিল। ভাবখানা এমন- এসব না জানলেই বা কি!

এখনেই হচ্ছে মূল সমস্যা। কারণ তারা জানে, এই দেশে কোন কিছু না জেনেও এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্ত হওয়া যায়! থাক তো এসএসসি’র জিপিএ ৫! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও যদি এই প্রশ্নগুলো করা হয়, আমার সন্দেহ আছে কয়জন সঠিকভাবে উত্তর দিতে পারবে! এভাবেই চলছে আমাদের দেশ!

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s