শিক্ষা আইনে অবারিত হউক এমপিও শিক্ষকের বদলি ও পদোন্নতি

শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদন্ড আর শিক্ষককে জাতি গড়ার কারিগর। শিক্ষিত প্রজন্ম জাতির অমূল্য সম্পদ । কিন্তু আজ একটি বড় প্রশ্ন নিত্যদিন সকলের মনে ঘুরপাক খায় । আর সেটি হচ্ছে , শিক্ষার জন্য শিক্ষক নাকি শিক্ষকের জন্য শিক্ষা ? কার জন্য কে অপরিহার্য ? শিক্ষা ও শিক্ষক উভয়ই শিক্ষার্থীর জন্য । শিক্ষানীতি কিংবা শিক্ষা আইন কার জন্য ? এ সবকিছু শিক্ষা , শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কল্যাণে নিবেদিত হওয়া উচিত । শিক্ষা ও শিক্ষার্থীকে বাঁচাতে আগে শিক্ষককে বাঁচানো অপরিহার্য।শিক্ষক না বাঁচলে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীকে বাঁচানো যাবে না ।

আমাদের শিক্ষায় সিলেবাস ও কারিকুলামে নানা অসঙ্গতি । পুস্তকের বোঝার নিচে চাপা পড়ে কঁচি শিক্ষার্থী । বইয়ের স্তূপ টেনে শিক্ষার্থী স্কুলে যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।পুস্তকের ব্যাগের ভারে পড়ার আনন্দ মাটি হয় ক্ষুদে শিক্ষার্থীর । বয়স, রুচি ও চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে আজকাল আর পাঠ্যপুস্তক রচিত হয় বলে মনে হয় না।

আমাদের শিক্ষায় আজ উক্তরুপ নানা অসঙ্গতি ও বৈষম্য বিদ্যমান । তাই , শিক্ষা থেকে আমাদের জাতি কাঙ্খিত ফল পাচ্ছে না । আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে যত বৈষম্য , তা পৃথিবীর আর কোথাও আছে কী-না জানা নেই । বিশেষ করে আমাদের এমপিও শিক্ষকদের বেলায় যত সব বৈষম্য আর অবহেলা ।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার প্রায় ৯৭% শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত । এ পর্যায়ের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত । তাঁরা প্রজাতন্ত্রের শিক্ষা পরিবারে সর্বাধিক সংখ্যক জনবল। কিন্তু, প্রজাতন্ত্রের কাছে তাঁরা নানারুপ অবহেলার শিকার । তাঁরা তাঁদের বহু ন্যায্য ও মৌলিক অধিকার থেকে আজো বঞ্চিত ।

আমরা আজ একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক । কিন্তু , একটা স্বাধীন শিক্ষানীতি পেতে আমাদের প্রায় চল্লিশ বছর পথ চেয়ে বসে থাকতে হয়েছে । সে স্বাধীন শিক্ষানীতিটি বাস্তবায়নের গতি খুব মন্থর বলে মনে হয় । ২০১০ সালে প্রণীত বহুল কাঙ্খিত শিক্ষানীতির আজো সিঁকি ভাগ বাস্তবায়িত হয়নি । এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আমাদের শিক্ষায় প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসবে , শিক্ষাক্ষেত্রে নানা বৈষম্যের অবসান হবে এবং সর্বোপরি দেশের এমপিও শিক্ষকদের নানা দূর্গতির অবসান হবে ।

‘বদলি’ ও ‘পদোন্নতি’ যে কোন চাকুরীজীবির মৌলিক অধিকার । মাইনে বা বেতনের মতো এ দু’টো অধিকার সকলের ন্যায্য পাওনা । প্রয়োজনের তাগিদে বদলি এবং মেধার স্বীকৃতি স্বরুপ পদোন্নতি যে কোন মানুষের কর্মোদ্যম ও কর্মস্পৃহা বহুগুণ বৃদ্ধি করে । বদলি কেউ এমনিতে প্রত্যাশা করে না । একান্ত প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ বদলি চায়। কিন্তু সে দ্বারটি যদি রুদ্ধ থাকে , তবে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । ফলে স্বীয় কাজে আনন্দ ও আগ্রহে ভাটা পড়ে ।

অনুরুপ , সব মানুষের মেধা কিংবা প্রতিভা সমান নয় । প্রকৃতিগত ভাবে মানুষে মানুষে মেধার পার্থক্য । কোন মানুষের মেধা ও প্রতিভার স্বীকৃতি তার আত্মমর্যাদা যেমন বৃদ্ধি করে , তেমনি তার কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে লাভবান হয় দেশ ও জাতি ।

প্রজাতন্ত্রের অধীনে জাতি গঠনের মতো গুরু দায়িত্ব পালন করেও এ দু’টি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ দেশের এমপিও শিক্ষকরা । বদলি না থাকায় তাঁরা যেন খাঁচাবন্দি কর্মজীবন অতিক্রান্ত করেন । এক জায়গায় কাজ করতে করতে তাঁদের এমন একটা একঘেঁয়েমি পেয়ে বসে , যা তাঁদের কর্মস্পৃহা ও কর্মোদ্যম হ্রাস করে । আবার , অতি প্রয়োজনে ও বদলি না থাকায় বেদনার যাঁতাকলে পিষ্ঠ হতে হয় তাঁদের । একই ভাবে মানুষ তার মেধা ও প্রতিভার স্বীকৃতি না পেলে তার আগ্রহে ভাটা পড়া একান্ত স্বাভাবিক । একই অবস্থায় থেকে কাজ করতে করতে যে কারো মনোবল ও আকাংখা বাঁধাগ্রস্ত হয় । পদোন্নতির সুযোগ মানুষের উচ্চাশা জাগ্রত করে এবং প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করে ।

তাই, সর্বত্র সব কাজে বদলি ও পদোন্নতি অপরিহার্য দু’টি বিষয় । বদলি ছাড়া যে কোন পেশার মানুষ খাঁচাবন্দি পাখির মতো, যার আকাশে উড়ার অনন্ত ইচ্ছা খাঁচার ভেতর কেবলি ছটফট করে মরে। পদোন্নতি ছাড়া যে কেউ মেঘ ঢাকা সূর্যের মতো, যে মেঘের আড়াল ছেদ করে পৃথিবীটাকে আলোকিত করার অদম্য আকাঙ্খা পোষণ করলে ও শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে আলোর মুখ দেখাতে পারে না ।

আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এ এমপিও শিক্ষকের পদোন্নতি ও বদলি বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। শিক্ষানীতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এমপিও শিক্ষকদের বহুদিনের লালিত এ দু’টি স্বপ্ন পূরণ হবে । আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতিতে এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতি বিষয়ে যে নির্দেশনা আছে , সে বিষয়ে এখানে একটু আলোকপাত করা খুবই প্রাসঙ্গিক হবে ।

শিক্ষানীতিতে ‘শিক্ষকের মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্ব’ শীর্ষক অনুচ্ছেদের (৩) উপ-অনুচ্ছেদে পদোন্নতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার সকল পর্যায়ে শিক্ষকের পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা এবং শিক্ষার সকল পর্যায়ে তাদের শিক্ষার মান বিবেচনায় আনা হবে । সে জন্য শিক্ষকের মান নির্ণয় করার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে । গৃহীত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার সর্বস্তরে পদোন্নতির বিবেচনায় আনা হবে।’

অনুরুপ, শিক্ষানীতিতে ‘শিক্ষানীতির আওতাধীন এমপিওভুক্ত সকল ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি ও পদোন্নতি’ শীর্ষক অনুচ্ছেদের ৫ নং উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে , ‘সকল পর্যায়ের সকল ধারার সকল স্তরের এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণের চাকুরী সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় বদলিযোগ্য হবে । সরকারি প্রয়োজনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণকে সমধারার সমস্তরের প্রতিষ্ঠানে সমপর্যায়ের পদে বদলি করা হবে ।’

বদলি ও পদোন্নতি বিষয়ে উপরোক্ত নির্দেশনা প্রতিপালনের উপযুক্ত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে । শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতির বিষয়টি অনেক আগে উপলব্ধি করলে ও আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তারা কেন এখনো তা অনুধাবন করতে পারেন না ?

সরকার সম্প্রতি একটি শিক্ষা আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে । এর খসড়া ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে দিয়ে তাতে সকলের মতামত আহ্বান করা হয়েছে । আমরা প্রত্যাশা করি ,চূড়ান্ত শিক্ষা আইন শিক্ষানীতির অনুসরণেই রচিত হবে। শিক্ষা আইন শিক্ষানীতির সাথে সাংঘর্ষিক হবে না । শিক্ষানীতিতে কোন ঘাটতি থাকলে তা যেন শিক্ষা আইনে পূরণ হয় । শিক্ষা আইন শিক্ষানীতির সম্পুরক কিংবা পরিপূরক হউক -সে আমরা সকলে চাই।

যেহেতু শিক্ষানীতিতে এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে , সেহেতু শিক্ষা আইনে তা বাস্তবায়নের কর্মকৌশল নির্ধারিত হওয়া উচিত । তাঁদের জন্য বদলি ও পদোন্নতি অবারিত করা প্রয়োজন । যত সত্বর এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতি চালু হবে , তত তাড়াতাড়ি জাতি এর সুফল ভোগ করতে শুরু করবে । শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে ও সম্পূর্ণ মানবিক কারণে অবিলম্বে এ দু’টি বিষয় চালু করা প্রয়োজন । এ দু’টি কাজে রাষ্ট্রের আর্থিক দায়-দায়িত্ব বর্তাবে সত্যি , তবে তা ক্ষতির কোন কারণ হবে না ।

এমপিও শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয়করণ ত্বরান্বিত করার জন্য তাঁদের বদলি ও পদোন্নতি চালু করার বিষয়ে কালক্ষেপন আর সঙ্গত হবে না। মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি দানের আগে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক হয়তো জানতে চাইবে , অন্যান্য সূচকের সাথে আমাদের দেশের এমপিও শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয়করণ করা হয়েছে কী-না ? ভিশন-২০২১’র কর্মপরিকল্পনা সফল ও পরিপূর্ণ করতে যা যা করা দরকার , সরকার তা-ই করবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ।

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে এমপিও শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতি অবারিত হবে-এমন একটি সুসংবাদ পাবার জন্য তাঁরা তীর্থের কাকের মতো চেয়ে বসে রয়েছেন ।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s