এবার আসছে ‘সরকারি কর্মচারী আইন’

সরকারি স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারী শারীরিক, আর্থিক বা অন্য কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাবেন। ফৌজদারি মামলা হলে, সেই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেয়ার আগে সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মচারীকে গ্রেফতার করা যাবে না। এমনকি কোনো কর্মচারী আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হলেও চাকরিতে বহাল রাখার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন রাষ্ট্রপতি।

উল্লিখিত বিধান রেখে ‘সরকারি কর্মচারী আইন-২০১৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে সরকার। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিদ্যমান ৪৬টি আইন, রুলস, বিধিমালা ও নির্বাহী আদেশের প্রয়োজনীয় ধারা অন্তর্ভুক্ত করে প্রস্তাবিত আইনটি চূড়ান্তকরণে তোড়জোড় চলছে। শিগগিরই তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। জনপ্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক বলেন, সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের কথা বলা হলেও এতদিন তা করা হয়নি। বর্তমান সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিদ্যমান আইন, বিধি ও নির্বাহী আদেশের প্রয়োজনীয় ধারা প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এটি নিয়ে আইন ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। শিগগিরই তা চূড়ান্ত করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

জানা যায়, সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ৪৪ বছরেও কোনো সরকার তা পালন করেনি। এতদিন পর্যন্ত বিধি, নীতিমালা ও প্রয়োজনমতো নির্বাহী আদেশ জারির মাধ্যমে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করেছে সরকারগুলো। কোনো কোনো সরকার এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ধরে নানা প্রক্রিয়া শেষে ২০১৪ সালের ২১ মে প্রস্তাবিত আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। একই বছরের ৩ আগস্ট আইনটির খসড়ায় সম্মতি দেয় প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি। এরপর গত বছরের ১৩ জুলাই সরকারি কর্মচারী আইনটির খসড়ায় নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।

বৈঠক শেষে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভুইঞা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি আইন করার কথা বহু বছর ধরে আলোচিত হচ্ছে। সেটি বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। আইন অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত কোনো অপরাধের অভিযোগে সাংবিধানিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থা তদন্ত করতে ও উপযুক্ত আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে। তবে এ সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলায় আদালতের অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার আগে কর্মচারীকে গ্রেফতারের প্রয়োজন হলে সরকারের পূর্ব অনুমোদন লাগবে।’

এরপর দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবিত আইনটি দ্রুত চূড়ান্ত করতে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগকে অনুরোধ জানানো হয়। তাদের (লেজিসলেটিভ বিভাগ) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বর্তমানে সরকারি সফরে ফ্রান্সে রয়েছেন। সেখানে যাওয়ার আগে কমিটিকে দ্রুত আইনটি চূড়ান্ত করার নির্দেশনা দিয়ে যান। ১৬ এপ্রিল তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। এর আগেই আইনটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দিনরাত কাজ করছেন। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, কমিটি ইতিমধ্যে দ্য সার্ভিস (রিঅরগানাইজেশন অ্যান্ড কনডিশন) অ্যাক্ট-১৯৭৫, দ্য পাবলিক সার্ভেন্টস (ডিসমিজল অন কনভিকশন) অরডিন্যান্স-১৯৮৫, গভর্নমেন্টস সার্ভেন্টস (স্পেশাল প্রভিশনস) অরডিন্যান্স-১৯৭৯, পাবলিক এমপ্লয়িজ ডিসিপ্লিন (পাংচ্যুয়েল এটেনডেন্স) অরডিন্যান্স-১৯৮২, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা-১৯৭৯, সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপিল) বিধিমালা-১৯৮৫, বিএসআর-৭ ও ১৫, ইন্ডিয়ান পাবলিক সার্ভিস বিল-২০০৭, উদ্বৃত্ত সরকারি কর্মচারী আত্তীকরণ আইন-২০১৫, আউটসোর্সিং নীতিমালা-২০০৮, সিভিল সার্ভিস আইনের খসড়া, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের খসড়া (মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত), পাবলিক সার্ভেন্টস (রিটায়ারমেন্ট) অ্যাক্ট-১৯৭৪, সরকারি কর্মচারী আচরণ অনুশাসন-আদেশাবলী, সরকারি কর্মচারী (বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ) অনুশাসন/আদেশাবলী এবং সরকারি কর্মচারী নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চতকরণ অনুশাসন/আদেশাবলীসহ বিদ্যমান ৪৬টি আইন, বিধিমালা, অনুশাসন ও আদেশাবলী চিহ্নিত করেছে। এসব আইনের প্রয়োজনীয় ধারা প্রস্তাবিত আইনে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিব নিয়োগ প্রসঙ্গে খসড়ায় বলা হয়েছে, সচিবদের মধ্য থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পদে নিয়োগ প্রদান করা হবে। এ দুটি পদ সচিব শ্রেণীভুক্ত হলেও এর স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা বিবেচনায় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সচিব হিসেবে নিয়মিত দায়িত্ব গ্রহণের দুই বছর পূর্তির পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তক্রমে ‘সিনিয়র সচিব’ হিসেবে গণ্য হবেন। রুলস অব বিজনেসে সিনিয়র সচিব পদটি উল্লেখ না থাকায় পদটির আইনগত ভিত্তি দিতে এরূপ প্রস্তাব করা হয়েছে বলে খসড়ায় বলা হয়েছে।

চাকরিচ্যুতির বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে, ‘কোনো গণকর্মচারী মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা এক বছরের বেশি কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকার ঊর্ধে জরিমানা বা উভয় প্রকার দণ্ডের বিধানসংবলিত ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হলে, রায় বা সাজার আদেশ ঘোষণার দিন থেকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত বলে গণ্য হবেন।’ এর বিকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো কর্মচারী আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হলে তার চাকরিতে বহাল রাখার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন রাষ্ট্রপতি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s